প্রথম ও দ্বিতীয় দফা পৌর নির্বাচন পর্যবেক্ষণের পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দৃষ্টিগোচর হয়েছে নাগরিক সমাজের। দ্বিতীয় ধাপে ভোটের হার প্রথম ধাপের চেয়ে কমেছে। প্রথম ধাপে ভোটের হার ছিল ৬৫ শতাংশ। আর দ্বিতীয় ধাপে ভোট পড়েছে ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৬৪ শতাংশ ভোট। আর বিএনপি পেয়েছিল সাড়ে ১৩ শতাংশ। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের ৬০ শতাংশ পড়েছে নৌকায়। আর ধানের শীষে পড়েছে ১৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। প্রথম ধাপের নির্বাচনে ১২টি পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছিলেন। আর দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ৩০টি পৌরসভায় জামানত হারিয়েছেন বিএনপি প্রার্থীরা।

প্রথমত, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর উপরোক্ত ফলাফল বিশ্নেষণ করলে বেশ কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়। প্রথম প্রশ্ন হলো ভোটের হারে। প্রথম দফা নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৫ শতাংশ আর দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ। অথচ আমরা দেখেছি, প্রথম দফা নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ভোটারের আকাল ছিল। আর দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে তুলনামূলক ভোটার উপস্থিতি বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও ভোট কম পড়ার কারণ কী?

দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন ওঠে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ভোটের হারে পার্থক্য নিয়ে। পৌরসভা নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছে যথাক্রমে ৬৪ শতাংশ ও ৬০ শতাংশ। আর বিএনপি পেয়েছে ১৩ শতাংশ ও ১৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। বিগত সময়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্যে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪৯ শতাংশ ভোট, আর বিএনপি পেয়েছিল ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ। সুতরাং বাস্তবতার সঙ্গে ঘোষিত পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফলের মিল দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ভোটের এত ব্যবধান! এটি সংগতিপূর্ণ মনে হয় না।

তৃতীয়ত, দুই ধাপের নির্বাচনে বিএনপির ৪০ প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। চারদিকে নৌকার জয়জয়কার, নৌকা গড়ে ৬০ শতাংশের ওপরে ভোট পেয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। নৌকার এমন জয়জয়কার মুহূর্তে হবিগঞ্জের মাধবপুরে জামানত হারিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। ওই পৌরসভায় মোট ভোট পড়েছে ১৩ হাজার ১০৫টি। জামানত ফিরে পেতে ভোট দরকার এক হাজার ৬৩৮টি। কিন্তু এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৬০৮ ভোট। এই পৌরসভায় চার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে তিনি চতুর্থ হয়েছেন! বিএনপির এত সংখ্যক প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্তের সঙ্গে কি আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা সংগতিপূর্ণ? বিএনপির বেশির ভাগ প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন, এটা কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়!

চতুর্থত, নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে ১০ হাজার ৭৩৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। সেখানে বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন এক হাজার ৭৭৮ ভোট। আর জামায়াত সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী এক হাজার ৪৫১ ভোট। এখানে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট প্রায় কাছাকাছি। এ ছাড়া আরও কয়েকটি পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে ধর্মভিত্তিক দলের প্রার্থীকে বেশি ভোট পেতে দেখা গেছে। এ ভোটহারের তাৎপর্য কী? তাহলে কি বিএনপির চেয়ে রাজনীতিতে জামায়াত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে? মধ্যমপন্থি রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির চেয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো শক্তিশালী হচ্ছে? এটা কিন্তু রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

পঞ্চমত, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব বলেছেন, তার ধারণা অনুযায়ী ইভিএম ও ব্যালটে গড়ে ৬০-৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। দ্বিতীয় ধাপের ৬০ পৌরসভার মধ্যে ২৯ পৌরসভায় ইভিএম এবং ৩১ পৌরসভায় ব্যালট পেপারে ভোট হয়েছে। এ নির্বাচনে ইভিএমের তুলনায় পেপার ব্যালটে ১৪ শতাংশ ভোট বেশি পড়েছে। নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরসভায়। এ পৌরসভায় ভোট পড়েছে ৮৫ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এখানে ১১ হাজার ৮৬৭ ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছে ১০ হাজার ৯২টি। এ পৌরসভায় ব্যালটে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে ঢাকার সাভার পৌরসভায়। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সাভার পৌরসভার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার উপস্থিতির কারণেই কি সেখানে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে? এ পৌরসভায় এক লাখ ৮৮ হাজার ভোটের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৬৩ হাজার ১৭৯ জন। ভোটের হার ৩৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এই পৌরসভায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ করা হয়। ইভিএম ব্যবহারের একটি বড় যৌক্তিকতা হলো জালভোট ঠেকানো। যদি তাই হয়, তাহলে ইভিএম ও ব্যালটে প্রদত্ত ভোটে এত পার্থক্য কেন? তাহলে কি ইভিএমে ভোটগ্রহণ সঠিক হয়েছে আর ব্যালটে কারচুপি হয়েছে? নাকি ব্যালটে ভোট গ্রহণ সঠিক হয়েছে, ইভিএমে কারচুপি হয়েছে?

এ প্রশ্নগুলো গুরুতর। আর এ প্রশ্নগুলো নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ব পালনে ইসির অপারগতার সঙ্গেই জড়িত। নির্বাচন কমিশনের আচরণ নিয়ে এটা নতুন কোনো প্রশ্ন নয়। এই কমিশন অতীতে আমাদের ভোটাধিকার হরণ করেছে- এমন অভিযোগ রয়েছে। আমরা দেখেছি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা কতটা পিছিয়ে পড়েছে। এই কমিশনের অধীনে বিগত বেশ কিছু নির্বাচনে সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতির দিক থেকে রেকর্ড হয়েছে। এ ধরনের কোনো দৃষ্টান্ত অতীতে আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ছিল না। আরও অভিযোগ রয়েছে, এই কমিশনের অধীনে বিগত জাতীয় নির্বাচনে মধ্যরাতে ভোট গ্রহণ হয়েছিল।

এই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কতকগুলো অভূতপূর্ব অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে করদাতাদের অর্থ প্রশিক্ষণের নামে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ এ কারণেই অভূতপূর্ব যে, অতীতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কারচুপির নির্বাচন করার কিংবা নির্বাচন পরিচালনায় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু অতীতে কোনোদিন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি।

নির্বাচনে সহিংসতা, জালভোট ও কারচুপির ঘটনা অতীতে ঘটেনি এমনটা বলার অবকাশ নেই। কিন্তু বিগত কয়েক বছর থেকে এই সহিংসতা বেড়েছে অনেক গুণ। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনেও বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি প্রতিপক্ষের হামলায় নির্বাচিত একজন প্রতিনিধির মৃত্যুও হয়েছে। এ ছাড়া জালভোট, এজেন্টদের বের করে দেওয়াসহ নানা অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের অভিযোগ ও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা অনিয়মগুলোকে আমলে নিতে চায় না। তারা বরাবরই এসব অনিয়ম-সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দায় এড়ায় মাত্র।

নির্বাচন নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন- নির্বাচনে কারচুপি, দায়িত্বে অবহেলা ও আর্থিক অনিয়মের কারণে বর্তমান কমিশন নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে তার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। এই কমিশনের উচিত হবে আর কোনো নির্বাচন পরিচালনা না করা। 

সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) 

তথ্য সূত্র: সমকাল, ১৯ জানুয়ারি ২০২১