চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও তার পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতাই প্রতিভাত হচ্ছে। যেভাবে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো হচ্ছে তাতে বলা চলে দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। চট্টগ্রামের নির্বাচনে কেবল আমরা মানুষ হত্যাই দেখিনি বরং আরও অনেক সংকট তৈরি করেছে। যেখানে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা জানি নির্বাচন কমিশনের হাতে অনেক ক্ষমতা রয়েছে। কমিশন চাইলেই যে কারও প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে। নির্বাচন স্থগিত করতে পারে। আমাদের সংবিধানের ১২৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য।’ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচন কমিশনকে আমরা প্রায় সব ক্ষেত্রে নির্বিকার থাকতে দেখি।
সংবাদমাধ্যম বলছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২৭ বছরে চট্টগ্রামে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
কার্যত সেখানে ভোটের আগে প্রচারের সময়ই দু’জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ কারণে ভোটের দিনের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল, সেখানে ঘাটতি ছিল বলেই আমাদের মর্মান্তিক এই মৃত্যু দেখতে হয়েছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত সেখানে দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা যেমন স্পষ্ট, তেমনি নানা অনিয়মের ঘটনাও আমাদের দেখতে হয়েছে। এমনকি অনেক ভোটার নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেননি। নানা জায়গায় নানাভাবে তারা বাধার শিকার হয়েছেন। ভোটকেন্দ্র থেকে বিরোধী দলের নির্বাচনী এজেন্টকে বের করে দেওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতিটি পর্যায়ের নির্বাচনেই আমরা দেখছি। চট্টগ্রামে আমরা আরও যে অভিযোগ দেখছি, তা হলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিরোধীদের ধরপাকড় করা হয়েছে। এতসব গুরুতর অভিযোগের কোনোটির ব্যাপারেই ইসি ব্যবস্থা নেয়নি।
ভোটার অনেকে যেমন ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি, আবার অনেকে কেন্দ্রে গেলেও ভোট দিতে পারেননি। এমনকি ইভিএম নিয়ে অতীতে যেসব প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলো আবার নতুন করে সামনে এসেছে। ইভিএমের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল- ভোটের কারচুপি রক্ষা করবে। অথচ বাস্তবে আমরা একজনের ভোট আরেকজনের দেওয়ার অভিযোগ দেখছি। তার ওপর ইভিএম যেহেতু একটি মেশিন; ভোট শেষে নির্দিষ্ট বাটনে চাপ দিলে দ্রুত ফল বেরিয়ে আসার কথা থাকলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে সাত-আট ঘণ্টা পরও ফল প্রকাশ না হওয়াটা বিস্ময়কর নয় কি? আমাদের এখানে ইভিএমের যে পদ্ধতি রয়েছে, প্রতিকার ব্যবস্থা না থাকায় কারচুপি করা সহজ। এমনকি ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে ভোটের হারও কম-বেশি করা সম্ভব। অথচ ভারতেও আমরা দেখেছি ইভিএমে ভোটার ভ্যারিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল (ভিভিপিএটি) যুক্ত করা রয়েছে। বাংলাদেশেও ইভিএমের কমিটি, যার চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী সেই পেপার ট্রেইলের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করে। ভোটারদের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য ইভিএমের সঙ্গে পেপার অডিট ট্রেইলের ব্যবস্থা করা যায়, যাতে ভোট দেওয়া সংক্রান্ত তথ্যের হার্ডকপি ভোট প্রদান শেষে সংরক্ষণ করা যায়। প্রয়োজনে পুনরায় ভোট গণনা করলেও সমস্যা না হয়। অথচ যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোতে এই সুবিধা নেই।
আমরা যদি ভোটারের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব- চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ভোটার রয়েছেন ১৯ লাখের মতো। এর মধ্যে চার লাখের কিছু বেশি মানুষের দেওয়া ভোটের মধ্যে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী একাই পেয়েছেন তিন লাখ ৬২ হাজারের ওপরে। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন পেয়েছেন ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট। অথচ এর আগের সিটি নির্বাচনেও আমরা খুব বেশি ব্যবধান দেখিনি। তার চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪১টি সাধারণ কাউন্সিলর ও ১৪টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে বিরোধী বিএনপি-জামায়াতের কেউই জয়ী হননি! ২০১৫ সালের নির্বাচনেও বিরোধীদের ৯ প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। এবারের ৫৪ বিজয়ীর মধ্যে আওয়ামী লীগ কিংবা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কীভাবে সবাই নির্বাচিত হলেন। বিষয়টিতে প্রশ্ন আসবেই। কারণ আমরা নির্বাচনের আগে বিরোধীদেরও প্রচার-প্রচারণা যেমন দেখেছি, তেমনি তাদের সমর্থকদেরও আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখেছি। তারা ভোটের ময়দানে থেকেও একটি কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত না হওয়ার বিষয়টি যেহেতু প্রশ্ন তৈরি করেছে, নির্বাচন কমিশনের উচিত বিষয়টি তদন্ত করে দেখা।
নির্বাচন কমিশন যেভাবে অভিযোগ আমলে নিয়ে যেখানে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন, সেখানে ব্যবস্থা না নিয়ে নির্বিকার হয়ে নির্বাচন পরিচালনা করছে, তাতে আমাদের জন্য এক ভয়ানক সংকট অপেক্ষা করছে। নির্বাচন কমিশনের এমন প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা স্বল্পসময়ের জন্য ক্ষমতাসীনদের লাভবান করলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশ বিপদে পড়বে। তাই অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে আনীত সব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। আমরা দেখছি, বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সব ক্ষেত্রে আমরা একই ধরনের অভিযোগ দেখছি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের আগে দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনেও সহিংসতা হয়েছে, মানুষ মারা গেছে, রক্ত ঝরেছে, ভোটারদের একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে ফেলেছে। প্রতিটি নির্বাচন এভাবে হলেও নির্বাচন কমিশনের বাড়তি কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াটা অগ্রহণযোগ্য। আজই তৃতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেজন্য অন্যান্য নির্বাচনের অভিজ্ঞতা নিয়েই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যেভাবে নানা অনিয়মের মধ্যে চট্টগ্রামের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার দায় কমিশনকেই নিতে হবে। যেভাবে নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, মানুষ নির্বাচনের ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছে;
একই সঙ্গে সহিংসতায় যেভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে, তার জন্য নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। নির্বাচন কমিশনই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নির্বাচন কমিশনের বিচার করতে হবে।
সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
তথ্য সূত্র: সমকাল ৩০, জানুয়ারি ২০২১

Leave a Reply