আমরা এ বছর বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, যা মানুষের জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। এ সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, যা আমাদের পুরো জাতির ভবিষ্যৎ গতিপথকেই বদলে দিয়েছে। কারণ রাজনীতিই সমাজ পরিবর্তনের বাহক এবং সকল অগ্রগতির নিয়ামক, যদিও রাজনীতি এখন আমাদের সমাজে অনেকটা ঘৃণার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। রাজনীতি, দুর্নীতি আর শঠতা আজ সমার্থক হয়ে গেছে। ফলে আমাদের তরুণ সমাজ, যারা আমাদের জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, আজ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছে- তারা রাজনীতির সঙ্গে জড়াতে অনাগ্রহী। বরং তাদের বড় অংশ আজ পলায়নপর এবং যে কোনোভাবে বিদেশে পাড়ি দিতে বদ্ধপরিকর। রাজনীতির প্রতি মানুষের ঘৃণাবোধ দৃশ্যমান গ্রামগঞ্জের অনেক চায়ের দোকানে, যেখানে রাজনীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ।
এত ঘৃণাবোধ ও অনীহা সত্ত্বেও, রাজনীতি একটি মহান ও অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনা-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া। এটি একটি আলাপ-আলোচনা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছার প্রক্রিয়া। এটি সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া, সমস্যা সৃষ্টির নয়। তাই তো বলা হয়, পলিটিকস ইজ দ্য আর্ট অব কম্প্রোমাইজ। আর এ কম্প্রোমাইজে পৌঁছার তথা রাজনীতির উদ্দেশ্য জনকল্যাণ, ব্যক্তি বা কোটারি স্বার্থ চরিতার্থ করা নয়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জনকল্যাণ সাধনের জন্য রাজনীতি হতে হয় আলোচনা-সংলাপনির্ভর ও বিশেষ কর্মসূচিভিত্তিক, যে কর্মসূচির সঙ্গে কোনো বিশেষ মূল্যবোধ ও আদর্শ জড়িত থাকতে পারে। আর এ কর্মসূচি বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য রাজনীতিবিদরা জনগণের হৃদয়-মন জয় করার প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত হন। এমন প্রতিযোগিতার রাজনীতিতে মতবিরোধ স্বাভাবিক হলেও, এতে দ্বন্দ্ব-হানাহানির ও জরবদস্তির কোনো অবকাশ থাকে না। অবকাশ থাকে না সহিংস কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথভিত্তিক সমাধানের। এ ছাড়া অবকাশ থাকে না ধর্মভিক্তিক, পরকালনির্ভর সমাধানের; কারণ রাজনীতির লক্ষ্য ইহকাল ও ইহকালসম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা।
স্লোগানসর্বস্ব, কর্মসূচি-বিবর্জিত রাজনীতিই হয় সাধারণত রাজপথভিত্তিক ও সহিংস। আর সহিংস জবরধস্তির রাজনীতিতে সমস্যার সমাধান তো হয়েই না, ববং এর মাধ্যমে সমস্যা আরও প্রকট হয় এবং ব্যাপক আকার ধারণ করে। সমস্যা আরও জটিল হয়। তাই রাজপথভিত্তিক, পেশিশক্তিনির্ভর সহিংসতা রাজনীতি নয়, বরং অপরাজনীতি। মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং এবং নেলসন ম্যান্ডেলার মতো ব্যক্তিরা ছিলেন জনকল্যাণের রাজনীতির অন্যতম ধারক ও বাহক এবং তাদের রাজনীতি ছিল মানুষকে অহিংস পথে ঐক্যবদ্ধ করার এবং মানবকল্যাণ অর্জনের। ব্যক্তি বা কোটারি স্বার্থ চরিতার্থ করা নয়। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতিও ছিল মূলত নিয়মতান্ত্রিক এবং এর লক্ষ ছিল জনমুক্তি ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি।
একটি সহিংস মুক্তযুদ্ধের মাধ্যমে- যে সহিংসতা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আশা করা হয়েছিল যে আমাদের রাজনীতিবিদরা অহিংস পথে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তথা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এবং জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমনুন্নত রাখবেন। নাগরিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করবেন। গণতন্ত্রের চর্চা করবেন। ধর্মনিরপেক্ষতা, সমতা, সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সৃষ্ট মানুষের মধ্যকার বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক একতাকে আরও জোরদার করবেন। তারা স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে ওঠে নাগরিকদের কল্যাণে সব সিদ্ধান্ত নেবেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নাগরিকদের এসব আকাঙ্ক্ষা দিন দিন ফ্যাকাশে হতে থাকে। কারণ রাজনীতিবিদরা জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনায় লিপ্ত হন। তারা সমঝোতার পরিবর্তে বিভক্তি ও নিশ্চিন্ন করার রাজনীতিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেন। তারা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ এবং নাগরিকদের আত্মোন্নয়নের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের উস্কানিমূলক স্লোগানের ভিত্তিতে বিভক্ত করে ফেলেন এবং তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-হানাহানি উস্কে দিতে থাকেন। তারা রাজনৈতিক স্বার্থে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার লক্ষ্যে ধর্মের ব্যবহার শুরু করেন, যা মানুষের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা ও পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনের বিস্তার ঘটায়। পরিণতিতে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণিভিত্তিক বিভক্তিকে অতিক্রম করার ঔদার্য ও স্বভাবজাত মানবিকতাবোধ, যা ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণা, আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। ফলে গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায়, ধর্মে-ধর্মে, এমনকি পরিবারের অভ্যন্তরেও বিরোধ ও হানাহানি সৃষ্টি হতে থাকে, যা আমাদের অনেকটা বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জাতিতে পরিণত করে। এমনিভাবে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অগ্রগতির পরিবর্তে অবক্ষয়ই ঘটতে থাকে, যা জনকল্যাণের পরিবর্তে বহু ক্ষেত্রে জনগণের অকল্যাণই ঢেকে এনেছে। হিন্দুদের ওপর এবং তাদের পূজামণ্ডপে ন্যক্কারজনক ও লজ্জাস্কর সাম্প্রতিক আক্রমণ এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ, যে ঘটনা জাতির ঘরে অগ্নি সংযোগের সমতুল্য এবং যে আগুন আমাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যে সমাজ যত ঐক্যবদ্ধ এবং যে সমাজের যত বেশি মানুষ সম্মিলিতভাবে আর্থ-সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য লক্ষ্যে এগিয়ে আসে, সে সমাজ তত বেশি দ্রুত এগিয়ে যায়। কারণ এর মাধ্যমে এক ধরনের ‘সামাজিক পুঁজি’ সৃষ্টি হয়, যে পুঁজি কাজে লাগিয়ে সামাজিক আন্দোলন ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে প্রায় বিনা খরচেই বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদির মতো বহু সামাজিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। তাই সামাজিক পুঁজি আর্থিক পুঁজির, যে পুঁজি আমাদের মতো দেশে অপ্রতুল, বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই সমাজে একতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা জাতি গঠনে এবং আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘নেশন কী?’, ‘ভারতবর্ষীয় সমাজ’, ‘স্বদেশীয় সমাজ’, ‘সফলতার সদুপায়’, ‘দেশীয় রাজ্য’ ইত্যাদি এবং শিক্ষাবিষয়ক অনেক প্রবন্ধে মানুষের আত্মশক্তি ও সমাজের সম্প্রতির ওপর ভিত্তি করে মানুষের আত্ম-সামাজিক উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক শাসকদের শোষণ ও বঞ্চনার মুখে এটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের নেশন-বিল্ডিংয়ের ধারণা। তিনি শাসকদের দয়া-দক্ষিণার ওপর নির্ভর না করে মানুষের এবং সমাজের শক্তির তথা আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করার কথা শুধু বারবার উচ্চারণই করেননি, এর কার্যকারিতা প্রদর্শনের লক্ষ্যে এক্সমেরিমেন্টেরও আয়োজন করেন। শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসার, শ্রীনিকেতনে গ্রামবাসীদের সংগঠিত করে এবং তার নোবেল প্রাইজের টাকা ব্যয় করে তিনি এগুলোর আয়োজন করেন।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ঔপনিবেশিক শক্তি, যার উদ্দেশ্য শোষণ, বঞ্চনা ও লাঞ্ছনা, তাদের কাছে অনুনয়-বিনয় করে, দাবি জানিয়ে, হাত পেতে কিংবা দরখাস্ত করে কিছু পাওয়া যাবে না- কিছু পাওয়া গেলেও তা হবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যে ভরা, যাতে আত্মমর্যাদাবোধ ভূলুণ্ঠিত হবে কিন্তু জনকল্যাণমূলক উন্নয়ন তেমনটা হবে না। তিনি আমাদের সমাজের ঐতিহ্য, প্রাণশক্তি, উদারতা ও মিলনমুখিতাকে পুঁজি করে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সরকারের বাইরে মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং সমাজ ও সামাজিক সহযোগিতাই তার উন্নয়ন ধারণার মূল চালিকাশক্তি। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে যে উন্নয়ন হয়েছে বহুলাংশে তার নায়কও হলো মূলত এ দেশের জনগণ। বাংলাদেশের মানুষের উদ্যম, সৃজনশীলতা ও ঝুঁকি গ্রহণের আগ্রহের কারণে জন্মলগ্নে অনেকের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অনেক বিশেষজ্ঞের বাংলাদেশকে উন্নয়নের টেস্টকেস হিসেবে আখ্যায়িত করলেও অর্থাৎ বাংলাদেশ পারলে যে কেউই পারবে- আমরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিশেষত সামাজিক সূচকে অগ্রগতি অনেককে হতবাক করেছে এবং অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো অর্থনীতিবিদরা একে বাংলাদেশ এনিগমা, ডেভেলপমেন্ট সারপ্রাইজ বা উন্নয়ন ধাঁধা বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর এ অগ্রগতি অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি। যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্যসহ অনেক খাতে স্বল্প ব্যয়ের সমাধান। যেমন স্বল্প খরচের রিং-স্লাবের তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা-ক্ষুদ্র ঋণ ইত্যাদি। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবশ্য প্রবাসী শ্রমিকদের আয়, কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা, ছোট ও মাঝারি সাইজের শিল্প-কারখানা স্থাপনে উদ্যোক্তাদের ভূমিকা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। এ ব্যাপারে সরকারের নীতি-কাঠামোগত সহায়তা এবং কিছু অবকাঠামো সৃষ্টি আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে বেগবান করেছে।
সাম্প্রতিককালে আমাদের অর্থনীতি অপরাজনীতি এবং এ থেকে উৎসারিত দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়ছে। গণতন্ত্র বনাম উন্নয়নের একটি ভ্রান্ত নেরেটিভের আবরণে ফায়দাভিত্তিক রাজনীতি চর্চার এবং ধার করে ও বিরাট পরিমাণের অর্থ ব্যয়ে অবকাঠামো তৈরিতে মেতে ওঠার ফলে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও লুটপাট আজ আমাদের সমাজে বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভ্রান্ত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত উন্নয়নের এ উন্মাদনার ফলে সারাদেশে অনেক অপ্রয়োজনীয়, নিম্নমানের এবং জনবিরোধী (যেমন কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প) অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। আমাদের ব্যাংক এবং স্টক মার্কেট লুট হয়েছে। রাজনীতিবিদ, এক শ্রেণির আমলা ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে সংগঠিত এসব লুটের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। আমাদের সমাজের ধনিক ও প্রভাবশালী শ্রেণির এসব স্বার্থপর আচরণ আমাদের ঔপনিবেশিক শাসনামলের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যখন বিদেশি শাসকরা শোষণ-বঞ্চনার মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্পদ নিজ দেশে নিয়ে যেত। এরই মধ্যে সামাজিক খাতে আমাদের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়েছে, যার বড় কারণ বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় পদে পদে প্রতিবন্ধকতা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘদিনের স্থবিরতাও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অবকাঠামো নির্মাণ অপরিহার্য হলেও, বিরাট পরিমাণের এবং অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণই উন্নয়ন নয়- অবকাঠামো নির্মাণ উন্নয়নের সহায়ক মাত্র। সত্যিকারের উন্নয়ন হলো মানুষের অবস্থা ও অবস্থানের উন্নয়ন, চাকচিক্যময় দালানকোঠা বা অবকাঠামো তৈরি নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পুষ্টি, সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি, নারী ও শিশুদের অবস্থার গুণগত পরিবর্তন ইত্যাদি। দুর্ভাগ্যবশত এসব অনেক ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়েছি। ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বাংলাদেশে এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। শুধু তাই নয়, রাজনীতি ও উন্নয়নের নামে রাজনীতিবিদরা আজ সমাজকে খণ্ড-বিখণ্ডিত করে ফেলেছেন। তাই আমরা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলি, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে কোন উন্নয়ন? কার উন্নয়ন? কী মূল্যে উন্নয়ন? আর দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির কবলে নিপতিত এ উন্নয়ন টিকে থাকবে তো?
আমাদের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থাও গণতন্ত্র বনাম উন্নয়নের এ ভ্রান্ত নেরেটিভের শিকার হয়েছে। আমরা আমাদের ভোটাধিকার হারিয়েছি। দেশে একদলীয় শাসন কায়েম হয়েছে। আমাদের অনেকগুলো মৌলিক মানবাধিকার হরন করা হয়েছে। বস্তুত আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রজাই বনে গিয়েছি, অধিকার ভোগকারী নাগরিক তথা রাষ্ট্রের মালিকে পরিণত হতে পারিনি। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠান ভাঙার এক ধরনের ডেমোলিশন ডার্বি বা উৎসব আমাদের দেশে পরিচালিত হয়েছে। মনোনয়ন বাণিজ্য ইত্যাদির কবলে পড়ে আমাদের হাউস অব দ্য পিপল বা জাতীয় সংসদ আজ ব্যবসায়ীদের, যাদের অধিকাংশই লুটেরা ও অসাধু, করায়ত্ত হয়েছে। বিচারহীনতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি আমাদের ওপর শক্তভাবে জেঁকে বসেছে। বর্তমানে আইন প্রণীত ও প্রয়োগ হচ্ছে (যেমন, ডিজিটাল সিকিউরিটিস অ্যাক্ট) জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থে। উপরন্তু জাতীয় সংসদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ হওয়ার কারণে আমদের হরাইজন্টাল অ্যাকাউন্টেবিলিটির কাঠামো ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন নির্বাসনে যাওয়ার ফলে ভার্টিক্যাল অ্যাকাউন্টিবিলিটির কাঠামোও ভেঙে পড়েছে। ফলে ক্ষমতাসীনদের আর জনগণের কল্যাণে কাজ করতে হয় না- বস্তুত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যারা তাদের ক্ষমতায় এনেছে এবং ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে, তাদের খুশি রাখতে পারলেই কেল্লাফতে। দুর্ভাগ্যবশত এসব অবক্ষয় ও অসংগতিই গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে তথা বাংলাদেশের ভবিষ্যতকেই গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ ধরনের অবক্ষয় এবং চ্যালেঞ্জ আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সংবিধান প্রণেতাদের সম্ভবত কল্পনারও বাইরে ছিল।
এটি আজ সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশ পথ হারিয়েছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে বহু প্রাণের বিনিময়ে এবং একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল- গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র তথা সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, তা থেকে বহু যোজন যোজন দূরে আমরা এখন অবস্থান করছি। দুর্ভাগ্যবশত এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো সহজ পথ নেই, নেই কোনো ম্যাজিক ফর্মুলা। কারণ ভাঙা যত সহজ, গড়া অনেক বেশি কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ।
এমনি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জনকল্যাণে পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে, এর শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং আমাদের ফাউন্ডিং ভেলুসগুলো আবার ফিরিয়ে আনতে হলে, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমেই একটি জনগণের ভোটে নির্বাচত সরকার প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক বলে আমরা মনে করি, যদিও নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। আর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই অর্থাৎ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার এবং টিকে থাকার জন্য প্রতি পাঁচ বছর পরপর জনগণের দ্বারে গিয়ে ভোট ভিক্ষা করার প্রয়োজন পড়লেই সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হবে এবং তাদের কল্যাণে কাজ করবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ :কিছু চিন্তাভাবনা’ বইতে যথার্থভাবেই লিখেছেন, ‘কোনো সরকার যদি জানে যে নির্বাচনের সময় তাকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে, তাহলে সেই সরকার নির্বাচনের পূর্বে যে সমস্ত ওয়াদা করবে তা পালন করবে … সরকার পরিচালনায় দুর্নীতি ও কালো টাকা কামাই করবার প্রবণতাও কমতে বাধ্য হবে, কারণ ক্ষমতা যখন ছাড়তেই হবে তখন দুর্নীতির দায়ে ধরা পড়ার সম্ভাবনাও থাকবে। কাজেই সরকার সচেতন হবে, সমাজ থেকে দুর্নীতির ব্যাধি কিছুটা হলেও কমবে।’ অর্থাৎ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করতে বাধ্য হবে এবং দুর্নীতি দূরীকরণের পথও সুগম হবে। আর জনগণের ভোটে এ ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেই গত ৫০ বছরে আমাদের রাজনীতিতে যে অবক্ষয় ঘটেছে, যা রাষ্ট্র মেরামতের এবং জাতি হিসেবে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে পর্বতপ্রমাণ বাধা সৃষ্টি করেছে, তা দূরীভূত হওয়ার পথ কিছুটা হলেও সহজ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক
তথ্য সূত্র: সমকাল | ২৬ অক্টোবর ২০২১

Leave a Reply