ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ৩০ জানুয়ারি হওয়ার কথা ছিল। সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অন্যতম উৎসব সরস্বতী পূজার কারণে ছাত্র আন্দোলন ও অনশন ধর্মঘটের পর অবশেষে নির্বাচন কমিশন তারিখ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনের তারিখ যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী প্রচারে উত্তাপও তত বাড়ছে। প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারকাজ চালাবেন, ভোট চাইবেন এবং ভোটারদের কাছে সিটি করপোরেশন নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানাবেন এটাই হওয়ার কথা। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে আদর্শিক ও চিন্তাগত পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু শেষদিকে এসে কিছু প্রার্থীর ওপর হামলা হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একজন মেয়র প্রার্থীর ওপর হামলা শুধু আচরণবিধিই লঙ্ঘন নয়, ফৌজদারি অপরাধও বটে।
এবার দুই সিটি নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির এই ঘোষণার পর ইভিএম নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিতর্ক শুধু রাজনৈতিক মহলেই সীমাবদ্ধ নয়, ইভিএম নিয়ে ভোটারদের মধ্যেও রয়েছে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও আস্থার সংকট। এই আস্থার সংকট পরিলক্ষিত হয় ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’ পরিচালিত এক অনলাইন জরিপের ফলাফলে। সুজনের ফেসবুক পেজে পরিচালিত এক জরিপে ১,৪০০ জন অংশ নেন, যার ৯১ শতাংশই আসন্ন সিটি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করেন।
ইভিএম ব্যবহারের ওপর আস্থার সংকটের মোটা দাগে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং যে প্রক্রিয়ায় কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদসহ অনেকগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা করেছে তার ওপর অনাস্থা। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কমিশন যে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নিচ্ছে তার ওপর অনাস্থা। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার সংকটের মূল কারণ হলো স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে তাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ। আমাদের নির্বাচনী আইনের প্রায় সবগুলোই বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লঙ্ঘিত হয়েছে। এতে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাসহ আরও অনেকেই জড়িত ছিলেন। কিন্তু কমিশন কারও বিরুদ্ধেই কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। একাদশ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ফলাফলেও দেখা যায় নানা অসঙ্গতি। প্রাথমিক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় : ১. ১০৩টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, যা অবাস্তব, অসম্ভব ও অকল্পনীয়। ২. ১,১৮৫টি কেন্দ্রে প্রধান বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা শূন্য ভোট পেয়েছেন এবং আওয়ামী লীগ দুটি কেন্দ্রে শূন্য ভোট পেয়েছে, যা কল্পনাতীত। ৩. ৫৮৬টি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এবং অন্য একটি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন জোটের প্রার্থী শতভাগ ভোট পেয়েছেন, যা বিশ্বাসযোগ্যও নয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের ওপর অনাস্থার আরেকটি কারণ হলো নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ছয়টি আসনে ইভিএমের ব্যবহার করা হয়। বাকি ২৯৪টি আসনে ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়। ইভিএমে ভোট পড়ার হার ছিল ৫১.৪২ শতাংশ। পক্ষান্তরে অন্য ২৯৪টি আসনে এ হার ছিল ৮০.৮০ শতাংশ। অর্থাৎ ইভিএমের তুলনায় ব্যালট পেপার ব্যবহৃত আসনগুলোর ভোটের হার ছিল ২৯.৩৮ শতাংশ বেশি। তাই কোনটি ভোট পড়ার সঠিক হার? ইভিএমের? না ব্যালটের? একই নির্বাচনে দুটি হার কোনোভাবেই সঠিক হতে পারে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এই ব্যাপারে জাতির কাছে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। অথচ এর সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য রয়েছে। যেমন, যদি পেপার ব্যালটে ভোট পড়ার হার সঠিক হয়ে থাকে, তা হলে ইভিএম ব্যবহারের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আর ইভিএমকে যদি সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয়, তা হলে ইভিএমের চেয়ে বাকি আসনগুলোতে ৩০ শতাংশ বেশি ভোট পড়া নিশ্চয়ই কারসাজি ও কারচুপির কারণে। যদি তাই হয়, তা হলে আমাদের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় কেলেঙ্কারি। এর জন্য নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই দায়বদ্ধ হতে হবে, দায়বদ্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে ইভিএমের ওপর আস্থার সংকট তৈরির অনেকগুলো কারণ রয়েছে। একটি কারণ হলো ইভিএম ক্রয়ের প্রক্রিয়া। দেখা যায়, প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান হওয়ার আগেই কমিশনের পক্ষ থেকে ইভিএম কেনার কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। ভারতের চেয়ে ১১ গুণ বেশি দামে প্রতিটি মেশিন ২ লাখ ৩২ হাজার টাকায় ইভিএম কিনেছে মর্মে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয় (একটি জাতীয় দৈনিক, ১৫ অক্টোবর ২০১৮)। এ ছাড়া রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়াই ইভিএম ব্যবহারে কমিশনের উদ্যোগ অতি উৎসাহের প্রতিফলন। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিইসি বলেছিলেন : ‘সব দল না চাইলে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না (একটি জাতীয় দৈনিক, ২৯ আগস্ট ২০১৮)।’ তাই রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অতি উচ্চ দামে ইভিএম কেনার কারণে কমিশনের ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় এবং জনমনে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়।
আস্থার সংকটের আরেকটি কারণ হলো আমাদের ইভিএমে ‘ভোটার ভেরিফাইড পেপার অডিট ট্রেইল’ (ভিভিপিআইটি) বা ইভিএমে প্রদত্ত ভোট কাগজে রেকর্ড হওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকা। ফলে ভোটারদের ভোট প্রদানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পায় এবং ভোটের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা পরে নিরীক্ষার কোনো সুযোগ থাকে না। ইভিএম কেনার আগে একটি কারিগরি ও পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী। এ ছাড়া একটি সাবকমিটি করে দেওয়া হয়েছিল, যে কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতেই ইভিএম কেনা হয়েছিল। কিন্তু জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে মূল কমিটি তা অনুমোদন করেনি। তাদের সুপারিশ ছিল এতে ‘ভিভিপিআইটি পেপার অডিট ট্রেইল’ রাখা, যাতে সঙ্গে সঙ্গে ভোটের রেকর্ড কাগজে লিপিবদ্ধ থাকে এবং ভোটার কাকে ভোট দিয়েছে ও তার ভোট কোথায় পড়েছে তার একটি প্রিন্ট-আউট পাওয়া যায় এবং পরে কোনো প্রশ্ন উঠলে যাতে অডিট করা যায়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ওই সুপারিশ অমান্য করে ইভিএম ক্রয় করে, যার ফলে জামিলুর রেজা চৌধুরী এতে স্বাক্ষর করেননি (একটি জাতীয় দৈনিক, ১৫ অক্টোবর ২০১৮)।
প্রসঙ্গত, ইভিএমে ‘ভিভিপিআইটি’ না থাকায় আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ইভিএম নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এই দুর্বলতা দূর করার জন্য দিল্লি হাইকোর্টের একটি রায় অনুসরণে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট ২০১১ সালে তাদের ব্যবহৃত ইভিএমে ‘ভিভিপিআইটি’ সংযুক্ত করার নির্দেশ দেন। সাত-আট বছর পর নির্মিত এবং অনেক বেশি দামে কেনা ইভিএমে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার ব্যাপারে আমাদের নির্বাচন কমিশনের উদাসীনতাও কমিশনের প্রতি অনাস্থার আরেকটি কারণ।
আস্থার সংকটের অন্য একটি কারণ হলো ইভিএমে ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল পাওয়ার কথা থাকলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক পরে তা প্রকাশ করা হয়েছে। এর কারণ কী, আমাদের জানা নেই। ইভিএমের যান্ত্রিক ত্রুটি? যান্ত্রিক ত্রুটি যদি হয় তা হলে তো এই ফলাফল কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যদি সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল ঘোষণা না করতে পারে, তা হলে পরবর্তীকালে কীভাবে তা প্রকাশ করা হলো? এখানে কোনো কারসাজি হয়েছে কিনা এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসন্ন সিটি নির্বাচনে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুজন ব্যক্তি ইভিএমের দায়িত্বে থাকবেন। আমাদের আশঙ্কা যে, যেহেতু কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা নেই, এর মাধ্যমে আমাদের সেনাবাহিনী বিতর্কিত হতে পারে।
আমরা মনে করি, ইভিএম নিয়ে বিতর্ক বহুলাংশে এড়ানো যেত, যদি ইভিএম নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা যেত এবং ইভিএমে ‘ভিভিপিআইটি’ যুক্ত করা হতো, তা হলে এটা একটা রক্ষাকবচ হতে পারত।
পরিশেষে, যেহেতু অতীত কর্মকা-ের কারণে নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থাহীনতা রয়েছে এবং ইভিএম নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে, তাই ঐকমত্য ছাড়া আগামী যে কোনো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করাই শ্রেয়। ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বহুলাংশে নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর, যার অভাবে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ইতোমধ্যেই জনগণের ব্যাপক অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষায় যেমন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব আছে, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদেরও দায়িত্ব আছে। সবার সহযোগিতায় নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে। খুলনা, গাজীপুর আর বরিশাল সিটি নির্বাচনের মতো ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে জালিয়াতির নির্বাচন দেখতে চাই না। নির্বাচন কমিশনারের কাছে একটা প্রত্যাশা করি, মানুষ যেন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০১৫-এর পুনরাবৃত্তি নয়, ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হোক, এটাই প্রত্যাশিত।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক
তথ্য সূত্র: আমাদের সময়, ২৫ জানুয়ারি ২০২০

Leave a Reply