“জনগণ দরিদ্র, কারণ তারা ক্ষমতাহীন। তাই জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য অবশ্যই তাদেরকে সংগঠিত করতে হবে। তাদের এমনভাবে সংগঠিত করতে হবে যাতে তারা নিজেরাই তাদের জীবন বদলাতে পারে।”
-স্যার ফজলে হাসান আবেদ, চেয়ারপার্সন, ব্র্যাক।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ। আমাদের প্রিয় আবেদ ভাই। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে একটি পরিচিত নাম। সারা পৃথিবীর দরিদ্র ও ক্ষমতাহীন মানুষের আপনজন, যিনি এশিয়া-আফ্রিকার পিছিয়ে পড়া অগণিত মানুষের জীবন বদলে দিয়েছেন। তাদের দুঃখ-কষ্টের সাথী হয়েছেন। তাদেরকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা দিয়েছেন।
তাদের জন্য কর্মসংস্থান করেছেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়তা করে তাদের জীবনকে অর্থবহ করেছেন। এ জন্য তিনি ব্যাপক সম্মান এবং স্বীকৃতিও পেয়েছেন। তার অবদানের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের সবাইকে গর্বিত করেছেন।
আবেদ ভাই ব্র্যাক’র প্রতিষ্ঠাতা। তিনি শুধু ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাই করেননি, এটিকে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। অনেকেই প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেন কিন্তু টিকিয়ে রাখতে পারেন না। প্রতিষ্ঠান ভেঙে যায়, কিংবা অকার্যকর হয়ে পড়ে। আবেদ ভাইয়ের বড় কৃতিত্ব তিনি ব্র্যাককে একটি কার্যকর ও চলমান প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। আমাদের চারদিকে তাকালে আমরা অনুধাবন করতে পারবো এটি যে, কত বড় কৃতিত্ব ও অবদান!
আবেদ ভাইয়ের আরেকটি বড় কৃতিত্ব- তিনি তাঁর মৃত্যুর আগে কয়েকজন যোগ্য ব্যক্তির হাতে ব্র্যাকের পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর করে গেছেন। আমাদের বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ আমরা উত্তরাধিকারী তৈরি করতে পারি না। আবেদ ভাই এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। গত আগস্ট মাসে তিনি একটি বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ব্র্যাকের নতুন নেতৃত্বকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, যে অনুষ্ঠানে আমারও থাকার সুযোগ হয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে তিনি ব্র্যাকের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করে নিজে ইমেরিটাস চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা সচরাচর ঘটে না।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা এবং কর্মে সহযোগিতা। বেশ কয়েক বছর আগে ধানমন্ডির ফিজিক্যাল কলেজ মাঠে আমাদের উজ্জীবকদের এক পুনর্মিলন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে সারা দেশ থেকে দশ সহস্রাধিক স্বেচ্ছাব্রতী উজ্জীবক অংশ নিয়েছিল। আবেদ ভাই সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এত অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে, তিনি সেখানে উজ্জীবকদের সহায়তা করার ঘোষণা দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় তিনি এমডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার, আমাদের একটি কাজে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন। ব্র্যাক ও হাঙ্গার প্রজেক্টের যৌথভাবে তিনবছরের এ প্রকল্পটি এত সফল হয়েছিল যে, পৃথিবী বিখ্যাত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক সম্মিলিতভাবে বিখ্যাত ‘আমেরিকান একাডেমি অব সায়েন্সের’ প্রসিডিংসে এ কাজের ওপর একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যা ছিল একটি অসামান্য স্বীকৃতি।
‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’র কাজের সম্পর্কে তাঁর ব্যাপক আগ্রহ ছিল। আমার কাছ থেকে তিনি সুজনের কাজের খুঁটিনাটি জানতে চাইতেন। এ কাজের জন্য তাঁর কাছ থেকে আমি সর্বদাই ব্যাপক উৎসাহ পেয়েছি।
কয়েক বছর আগে আবেদ ভাই আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে এনজিওদের এপেক্স বডি ‘এফএনবি’ এবং ‘এডাব’কে একত্রিত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আবেদ ভাইসহ এ দু’টি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেও এদেরকে একত্রিত করা যায়নি। ফলে এনজিওরা একটি বিভক্ত শক্তি হিসেবেই রয়ে গেছে।
পরিশেষে, স্যার ফজলে হাসান আবেদ লন্ডন-আমেরিকার মত উন্নত শহরে নিজের জীবন অতিবাহিত করতে পারতেন। বড় চাকরি করে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু নিজ সমাজের এবং মানুষের জন্য কাজ করাকেই নিজের জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলেন তিনি। তিনি নিজের ভবিষ্যৎকে উৎসর্গ করেছিলেন বাংলাদেশের এবং পরবর্তীতে এশিয়া-আফ্রিকার অসংখ্য মানুষের জন্য একটি নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টির লক্ষ্যে। আমরা এ কৃতী মানুষটির স্মৃতির প্রতি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা জানাই এবং বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
লেখক: গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট
তথ্য সূত্র: মানবজমিন, ২২ ডিসেম্বর ২০১৯

Leave a Reply