প্রথমবারের মত চেয়ারম্যান পদে দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত চার দফা নির্বাচনে আমরা যে প্রবণতা লক্ষ্য করেছি তা হলো— ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী সহিংসতা, ক্ষমতাসীনদের জয়জয়কার, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা ও এর দায় না নেয়া। আরেকটি বড় প্রবণতা হলো নির্বাচনে ব্যাপকহারে মনোনয়ন বাণিজ্য। এসব কারণে আমরা এক ধরনের বিকৃত নির্বাচন লক্ষ্য করছি।
আমরা দেখছি, এবার প্রথমবারের মত তৃণমূল পর্যায়েও মনোনয়ন বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। আগে আমরা মনোনয়ন বাণিজ্য শুধু সংসদ নির্বাচনেই লক্ষ্য করেছি। ব্যাপক মনোনয়ন বাণিজ্য বেশ উঁচু স্তরে হয় এবং হয়েছে বলে গুজব রয়েছে। মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণেই আমাদের সংসদ এখন ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে বিরাজনীতিকরণও ঘটেছে — রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাত থেকে ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এ বিষয়টি এখন তৃণমূল পর্যায়ের ইউপি নির্বাচনেও বিস্তৃত হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে কিছু বিনা পুঁজির ব্যবসায়ী সৃষ্টি হয়েছে। আর দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণেই মূলত এমনটি হয়েছে। এ মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে একদিকে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন কলুষিত হচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূলের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানও এর দ্বারা বিনষ্ট হচ্ছে।
যেহেতু দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে জয়ী হওয়াটা অনেকটা সহজ হয়ে যায় — যেখানে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সততা ও যোগ্যতার বিষয়টি মুখ্য নয় — তাই এবার অনেকটা রাখঢাক না রেখেই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মনোনয়ন বাণিজ্য চলছে। তবে পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচনের কারণে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যাপকভাবে বাণিজ্য ঘটছে। কারণ ক্ষমতাসীন দল থেকে মনোনয়ন পাওয়া মানে জয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যাওয়া।
দলভিত্তিক নির্বাচনের কারণে প্রার্থীদের অনেকেই মনোনয়ন বাণিজ্যের শিকার হয়েছেন বলে আমরা মনে করি। অনেকটা বাধ্য হয়েই অনেকে এ প্রক্রিয়ায় অর্থ দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। তারা আসলে পরিস্থিতির শিকার বা ভিকটিম। দলীয়ভিত্তিক নির্বাচন করার ফলে টাকা-পয়সা খরচ করে মনোনয়ন কিনতে হচ্ছে! স্বেচ্ছায় নয়, অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদেরকে এটা করতে হচ্ছে। এতে করে অনেক নিবেদিতপ্রাণ, ক্লিন-ইমেজের প্রার্থী টাকা-পয়সার অভাবে বা টাকা দিয়ে দলীয় মনোনয়ন কিনতে অনাগ্রহের কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এর ফলে আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এবং তৃণমূলে গণতন্ত্রের বিকাশ ব্যাহত হলো।
আমরা এ নির্বাচনে তিন ধরনের মনোনয়ন বাণিজ্য লক্ষ্য করছি: ১. নির্বাচনের পূর্বে দলীয় মনোনয়ন পেতে এবারকার নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের তিনটি রেটের কথা আমরা শুনেছি: মনোনয়ন বাগিয়ে দেয়ার জন্য এক রেট; মনোনয়নের পর নির্বাচনে জিতিয়ে দেয়ার জন্য আরেক রেট এবং মনোনয়ন, নির্বাচনে বিজয়ী করা ও গেজেট প্রকাশ নিশ্চিত করার জন্য আরো বড় রেট। এই প্রক্রিয়ায় এবারের নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা হাত বদল হয়েছে। বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন; ২. টাকার বিনিময়ে পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে জিতিয়ে দেয়ার জন্য দলের ভেতর একটি সিন্ডিকেট তৈরি হওয়া; এবং ৩. একই প্রক্রিয়ায় ঐ সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই গেজেট প্রকাশ করা।
অনেকটা প্রকাশ্যেই যে নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য চলছে সে সম্পর্কে ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২৫ এপ্রিল ২০১৬ ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগেও চলছে মনোনয়ন বাণিজ্য। স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ কেন্দ্রীয় ১৩ নেতা এই মনোনয়ন বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন বলে দলের হাইকমান্ডের কাছে অভিযোগ এসেছে … এ কারণে সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে সহস্রাধিক অভিযোগ ধানমণ্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা পড়লেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চতুর্থ ধাপ নমিনেশন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর কক্সবাজারের একটি উপজেলার নেতারা কেন্দ্রে অভিযোগ নিয়ে আসেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বিরুদ্ধে। ইউনিয়ন ও উপজেলা আওয়ামী লীগ যৌথ সভা ও ভোটের মাধ্যমে একক প্রার্থী বাছাই করলেও জেলা সভাপতি সে তালিকা জমা নেননি। তিনি তার ইচ্ছামতো প্রার্থী তালিকা করে কেন্দ্রে পাঠান। হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার ৪ নম্বর পাইকপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সরকারি সম্পদ লুটসহ একাধিক গাছ চুরির মামলার আসামি, বর্তমান চেয়ারম্যানকে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের মনোনয়ন বোর্ড একক প্রার্থী হিসেবে নাম প্রস্তাব করেছে।’
প্রথম দফার নির্বাচন থেকেই আমরা মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ শুনছি। যেমন, ১ মার্চের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলার পাটকেলঘাটা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন শহিদুল ইসলাম হূদয়। তার অভিযোগ তৃণমূল আওয়ামী লীগ তাকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিতে সংগঠনটির জেলা পর্যায়ে সুপারিশ পাঠিয়েছিল। কিন্তু টাকার বিনিময়ে জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা শিশির দাসের নাম পাঠান কেন্দ্রে। একইভাবে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদের প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শাহজাদা তালুকদারের নাম ঠিক করে জেলায় পাঠানো হয়। জেলা থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদানকারী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বাবুলকে। শাহজাদা তালুকদার অভিযোগ করেছেন অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বাবুলকে টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
শুধুমাত্র আওয়ামী লীগেই নয় বিএনপিতেও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। ২৪ এপ্রিল ২০১৬ ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিএনপিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন এবং দলের পদ-পদবি বিক্রির একটি বাণিজ্য সিন্ডিকেট বিত্ত-বৈভবের পাহাড় গড়ছে। চেয়ারপার্সনের গুলশান অফিসে এই সিন্ডিকেটের ঘাঁটি। বেগম খালেদা জিয়া যাদের বিশ্বাস করে বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়েছেন তারাই এখন তার অফিসকে ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’ করে নিয়েছেন। এ যেন সরিষার ভেতরেই ‘ভূত’।…স্থানীয় নির্বাচনে দলের প্রার্থী হতে হলে বেশিরভাগ প্রার্থীকে গুণতে হয় নগদ টাকা। এজন্য এই সিন্ডিকেট ফাঁদ পাতে।’
মনোনয়ন বাণিজ্যের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে এমনটা দাবি করে ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে প্রার্থী দিয়ে ৩০ লাখ টাকার মনোনয়ন বাণিজ্যেরও উল্লেখ আছে। দাউদকান্দির ইউনিয়ন নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে একজন প্রার্থীর কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ৬ লাখ টাকা।’
এবারকার নির্বাচনে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বিএনপির অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে নির্বাচনে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আমরা এ রকমও শুনেছি যে, একজন প্রার্থী দশ লাখ টাকার বিনিময়ে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি মনোনয়ন পাওয়ার পর আজ প্রার্থীর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা পেয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। এছাড়া বিএনপির অনেক প্রার্থী নিরাপত্তা না পাওয়ার আশ্বাসে প্রার্থী হননি অথবা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এ বিষয়গুলোও আমাদের উদ্বিগ্ন করে।
এবারের নির্বাচনে কিছু পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কারসাজির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল অনেক প্রার্থীকে জিতিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকার বিনিময় তা ঘটেছে বলেও আমরা শুনেছি। উদাহরণস্বরূপ তৃতীয় দফায় কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বুড়িচং সদর ইউপি নির্বাচনের ভোটগ্রহণকালে ৩নং জগত্পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের দুইজন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা একজন প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট পেপারে সিল মারার অভিযোগ ইসিতে আসে। পরে এ দুইজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি, পাইন্দং ও কাঞ্চননগর ইউপিতে। ভোটে কারসাজি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন খোদ সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থীরাও। আর একটি পত্রিকায় গত ২৮ এপ্রিলে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, স্থানীয় এমপির নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভোট জালিয়াতি করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সরকারি দলের কিছু মনোনীত প্রার্থী।
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, কেন্দ্র দখল, অবিশ্বাস্য পরিমাণ ভোট পড়া ও সহিংসতাসহ নানা অনিয়মের বিষয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে সহস্রাধিক অভিযোগ জমা দিয়েছেন। কিন্তু কমিশন সেগুলো তদন্ত না করেই নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিধি অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ইউপি’র নির্বাচন বাতিল করতেও পারে কমিশন।
আমরা মনে করি, দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজন এবং মনোনয়ন বাণিজ্য রোধ করতে হলে সুস্পষ্ট মনোনয়ন প্রক্রিয়া থাকা দরকার। প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় দলের তৃণমূলের কমিটিগুলোর মতামতের ভিত্তিতে তৈরি প্যানেল থেকে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু অধ্যাদেশটি নবম সংসদে অনুমোদনের সময় এ বাধ্যবাধকতা রহিত করে প্যানেলটি শুধু বিবেচনায় নিয়ে মনোনয়ন দেয়ার বিধান করা হয়, যা ছিল দুঃখজনক। আমরা মনে করি, জাতীয়সহ সকল নির্বাচনে দলের তৃণমূলের কমিটিগুলোর মতামতের ভিত্তিতে তৈরি প্যানেল থেকে মনোনয়ন দেয়া বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা গেলে অন্তত দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা হবে, যদিও মনোনয়ন বাণিজ্যে তা কোনো ভূমিকা রাখবে কিনা সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।
আমাদের মনে রাখা দরকার, নির্বাচনে এইসব নীতিহীন আচরণের কারণেই আমাদের রাজনীতি আজ, মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষায়, ‘ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢুকে গিয়েছে’। আমাদের সংসদ সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ বর্তমানে ব্যবসায়ী। একইভাবে ইউপি নির্বাচনে যেহারে মনোনয়ন বাণিজ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে তা রোধ করতে না পারলে প্রার্থীর যোগ্যতাকে নিম্নমুখী করবে এবং সত্, যোগ্য, সম্মানিত এবং স্থানীয় মানুষের আস্থাভাজন রাজনীতিবিদ নির্বাচনী মাঠ থেকে বিতাড়িত হবেন, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ১২ মে, ২০১৬


Leave a Reply