আমার ছাত্রজীবনের সহপাঠী, বর্তমান অর্থমন্ত্রী, আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরের বাজেট সংসদে পেশ করেছেন। এ বিরল সম্মানের জন্য আমার পক্ষ থেকে তাঁকে অভিনন্দন। তবে দুর্ভাগ্যবশত তাঁর প্রস্তাবিত বাজেটের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানাতে পারছি না, যার জন্য আমি দুঃখিত।

বর্তমান সরকারের উন্নয়নের অগ্রাধিকার হলো অবকাঠামো তৈরি, যা দেখা-ধরা-ছোঁয়া যায়, যাতে বিরাট অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয় এবং যা থেকে নিজের অনুগতদের ফায়দা ও বিভিন্ন ধরনের অযাচিত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর যখন থেকে সরকারের ‘লেজিটিমেসির’ সমস্যা দেখা দেয়, সরকার অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার করে। কিন্তু সত্যিকারের উন্নয়ন হলো মানুষের অবস্থা-অবস্থানের পরিবর্তন, যার উৎস হলো মানুষের শিক্ষার-স্বাস্থ্যের-পয়োনিষ্কাশনের-পরিবেশের উন্নয়ন, নারীর অবস্থার পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, সুশাসন ইত্যাদি, যার জন্য অবশ্য অবকাঠামো তৈরিও প্রয়োজন।

টিকা কেনার এবং দ্রুততম সময়ে সব নাগরিককে টিকা প্রদানের জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে অর্থমন্ত্রী সাধারণ জনগণের গুরুতর স্বার্থহানি করেছেন। তিনি রূপপুরের মতো একটি ভয়ানক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের, যা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, বরাদ্দ কমিয়েই অতিরিক্ত টিকা আমদানির ব্যবস্থা করতে পারতেন

অর্থমন্ত্রী গর্ব করে বলেন যে তাঁর জন্ম সচ্ছল পরিবারে নয়, যদিও এখন তিনি বর্তমান সংসদের সবচেয়ে বিত্তশালী ১০ জনের একজন এবং অকপটে স্বীকার করেছেন যে ‘বাজেট পুরোটাই ব্যবসাবান্ধব’। অর্থাৎ আবারও গোষ্ঠীস্বার্থেই বাজেট প্রণীত হলো, যাতে সাধারণ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদির প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। এই স্বার্থসংশ্লিষ্টদের অন্যতম হলো ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, যারা শুধু অর্থনীতিই নয়, এ দেশের রাজনীতিও বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করছে। বস্তুত আমাদের জাতীয় সংসদকে এখন এফবিসিসিআইয়ের বর্ধিত অংশ বললে অত্যুক্তি হবে না। আমি কোনোভাবেই ব্যবসায়ীদের বিপক্ষে নই এবং তাঁদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে উৎসাহিত করার পক্ষে; তবে তাঁদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণে ব্যবসায়ের যে রাজনৈতিকীকরণ এবং রাজনীতির যে ব্যবসায়ীকরণ হয়েছে, তাতে জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি।

আরেকটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণে, সরকার এদের ওপর ক্ষমতায় যাওয়ার এবং টিকে থাকার জন্য বহুলাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আইন লঙ্ঘন করে এবং নির্বাচনী অপরাধে জড়িত হয়ে, যার জন্য আরপিওতে ২-৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে, ক্ষমতাসীনদের এ ‘সেবা’ প্রদানের জন্য সরকার তাঁদের প্রতি বদান্যতা প্রদর্শন করতেও কুণ্ঠা করেনি। গত এক দশকে বেতন–ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় বেড়েছে ২১১ শতাংশ।

করোনা অতিমারির বর্তমান অর্থবছরে যেখানে অসংখ্য জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা তছনছ হয়ে গেছে এবং প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নিপতিত হয়েছে, সেখানে এই কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শুধু তা–ই নয়, প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরেও তাঁদের বেতন–ভাতা ৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে প্রাক্কলিত ৩ লাখ ৬৬ হাজার কোটি পরিচালনা ব্যয়ের ১৯ শতাংশে এসে দাঁড়াবে। আর এর সঙ্গে পেনশন যুক্ত করলে তা দাঁড়াবে ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির জাঁতাকলে পিষ্ট হলেও বাজেটে প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নামক স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ ভালোভাবেই সংরক্ষিত হবে।

সরকার পরিচালনা কাজে নিয়োজিত এ স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই বিরাট পরিমাণের অর্থ ব্যয় করে আমরা যেন একটি স্বেতহস্তীই পালন করছি। বেতন–ভাতাসহ অনেক ধরনের প্রণোদনা প্রদান সত্ত্বেও প্রশাসনে ক্রমান্বয়ে দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে, যা–ও সাধারণ জনগণের স্বার্থহানি ঘটায়। এ ছাড়া জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকার ক্রমাগতভাবে আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে জনগণের পরিবর্তে তারাই সব ক্ষমতার উৎসে পরিণত হচ্ছে, যা সুশাসন তথা গণতান্ত্রিক শাসনের সম্পূর্ণ অন্তরায়।

আর বাজেট বাস্তবায়নের হার বৃদ্ধি এবং সাধারণ জনগণের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যবশত বর্তমানে আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে, যা কার্যকর না হলে বাজেট বাস্তবায়ন হার তো বাড়বেই না, বরং আমরা ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হব। প্রশাসনিক ব্যবস্থার খুঁটি হলো মূলত তিনটি—জনস্বার্থে আইন-বিধিবিধান প্রণয়ন ও সঠিক প্রয়োগ, যথার্থ নিয়ম-পদ্ধতি এবং কার্যকর ও জনমুখী প্রতিষ্ঠান। এ তিন ক্ষেত্রেই আমরা ক্রম অবনতির দিকে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অকল্যাণকর। কারণ, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার, আইনের শাসনের অভাব এবং মানবাধিকারের চরম পদদলনসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়া বাজেট বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বার্থহানিও ঘটায়। কারণ, সুশাসনের অভাব সমাজের প্রভাবশালীদেরই স্বার্থ সংরক্ষণ করে। দুর্ভাগ্যবশত বাজেটে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

ব্যবসায়ীবান্ধব এ বাজেট প্রণয়নে জীবিকা রক্ষা করা নিয়ে আমরা সন্দিহান। তবে জীবিকার সঙ্গে জীবন বাঁচানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, জীবন না বাঁচলে জীবিকা অপ্রাসঙ্গিক। সাধারণ মানুষ অর্থবিত্তের দিক থেকেই শুধু নয়, তারা শিক্ষা-দীক্ষা ও সচেতনতার দিক থেকেও অনেক পেছনে, তাই করোনাভাইরাস তাদের জন্য অধিক ঝুঁকির কারণ। এ ছাড়া বিশেজ্ঞদের মতে, সুস্বাস্থ্যের অন্যতম নিয়ামক হলো ‘সোশ্যাল ডিটারমিনেন্টস অব হেলথ’ বা স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ধারক’, যা নির্ভর করে যে পরিবেশে মানুষ জন্মায়, বড় হয়, বসবাস করে, কাজ করে এবং জীবন ধারণ করে তার ওপর, যার সব কটিই সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ।

করোনাভাইরাসকে সফলভাবে প্রতিহতের মূল উপায় হলো স্বাস্থ্যবিধি মানতে ও অভ্যাস পরিবর্তন করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, রোগীদের আইসোলেশনে রাখা, সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়াদের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা, সর্বোপরি টিকার আয়োজন করা। অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেটে মাসে ২৫ লাখ ব্যক্তিকে টিকা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন, যার অধিকাংশই পাবেন সমাজের উঁচুতলার মানুষেরা। আর এ হারে টিকা দেওয়া হলে সব নাগরিককে টিকার আওতায় আনতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে, যা দরিদ্রদের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।

এ ছাড়া দেশে টিকার অপ্রতুলতা উচ্চবিত্তদের জন্য অগুরুত্বপূর্ণ; কারণ, তাঁরা বিদেশে গিয়ে কিংবা বিদেশ থেকে আনিয়ে নিজেরা টিকা নিতে পারবেন। এ ছাড়া অসুস্থ হলে গরিবদের হাসপাতালেও ঠাঁই হয় না। তাই টিকা কেনার এবং দ্রুততম সময়ে সব নাগরিককে টিকা প্রদানের জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে অর্থমন্ত্রী সাধারণ জনগণের গুরুতর স্বার্থহানি করেছেন। তিনি রূপপুরের মতো একটি ভয়ানক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের, যা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, বরাদ্দ কমিয়েই অতিরিক্ত টিকা আমদানির ব্যবস্থা করতে পারতেন।

ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো | ০৯, জুন ২০২১