২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে বহুল আলোচিত ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের মধ্যে প্রথম কিস্তি হিসাবে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার পেয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি অসহনীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ঘাটতি ইত্যাদি নানাবিধ অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছে এ ঋণসহায়তার আবেদন করে। ঋণের শর্ত হিসেবে আইএমএফ আর্থিক খাতে কতগুলো সংস্কারের শর্ত দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আইএমএফ প্রদত্ত এ ঋণ কি দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে পারবে? নাকি ফুটো কলসিতে ঢালা পানির মতো বের হয়ে পড়বে?

আইএমএফ প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো যে জরুরি, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তা সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা, আমাদের বর্তমান সংকটটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এর সঙ্গে দুটি রাজনৈতিক বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি হলো কার্যকর গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি তথা ‘ডেমোক্রেটিক ডেফিসিট’। অপরটি সুশাসনের অভাব বা ‘গভর্ন্যান্স ফেইলিওর’। এই সংকটগুলোর মধ্যে গভীর যোগসূত্র আছে। বস্তুত এগুলো একই সূত্রে গাঁথা এবং একে অন্যের পরিপূরকও বটে।

গণতন্ত্রের প্রধানতম অনুষঙ্গ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু ২০১৪ ও ২০১৮ সালের দুটি একতরফা ও ব্যর্থ জাতীয় নির্বাচনের কারণে সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করার অন্যতম একটি মাধ্যম ভেঙে পড়েছে। যেহেতু প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ক্ষমতাসীনদের আর জনগণের কাছে ‘ভোটভিক্ষার’ জন্য যাওয়ার প্রথা ভেঙে গেছে, অর্থাৎ ‘নির্বাচিত’ হওয়ার জন্য ক্ষমতাসীনদের আর জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয় না, তাই সরকারের আর জনগণের স্বার্থে ও কল্যাণে কাজ করার দায়বদ্ধতা নেই। যাঁরা তঁাদের ক্ষমতায় এনেছেন ও ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছেন এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে যাঁদের ওপর নির্ভর করতে হবে, সরকারকে সেই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরই সন্তুষ্ট রাখতে হয়।

অর্থাৎ, ভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ‘নিম্নমুখী’ দায়বদ্ধতার অতি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো আমাদের দেশে ভেঙে পড়েছে। বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের বৈধতার সমস্যা মোকাবিলার জন্য সরকারকে বলপ্রয়োগ ও নানা কালাকানুনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার হরণ করতে হয়। বাংলাদেশে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে প্রবর্তিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তী সময় নতুন নতুন আইনকানুন করে মানুষের মতপ্রকাশের অধিকারকে আইনি প্রক্রিয়ায় হরণ করা হয়েছে। এগুলোই গণতন্ত্রের ঘাটতির অন্যতম কারণ।

অর্থনৈতিক সংকটের আজকের এ ভয়াবহতার জন্য দ্বিতীয় যে বিষয়টি প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে, তা হলো গভর্ন্যান্স ফেইলিওর বা সুশাসনের অভাব। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের অভাব থেকে শুরু করে ন্যায়পরায়ণতার অনুপস্থিতি, স্বচ্ছ-জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ ও জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের অভাব। সরকারের আশীর্বাদপুষ্টরা যে যেখানে পারছেন, গোষ্ঠীতন্ত্র কায়েম করে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন।

দুর্ভাগ্যবশত বন্দোবস্তটি ভেঙে দেওয়া হয় সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক উপায়ে এবং উচ্চ আদালতের রায়ের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে একতরফাভাবে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত না হলে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, ফুটো কলসি সিনড্রোমের কারণে যা দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আমাদের আশঙ্কা।

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতায় লুটপাটের আয়োজন এবং বিদেশে অর্থ ও সম্পদ পাচারের ঘটনার স্বরূপ উন্মোচিত হলেও তাঁরা বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। একই সঙ্গে পাতানো বিরোধী দল সৃষ্টি ও বিচার বিভাগের দলীয়করণের কারণে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস’ পদ্ধতি তথা আমাদের সমান্তরাল দায়বদ্ধতার কাঠামোও বিলীন হয়ে গেছে। আমাদের আমলাতন্ত্র এখন ‘জনগণের সেবক’ অপেক্ষা ‘জনগণের প্রভু’, যা বাংলাদেশে

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আরেকটি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং লুটকৃত টাকা বিদেশে পাচারসহ নানা অনিয়মের কারণেই দেশে এ অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে…যা কোভিড–১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরও প্রকট রূপ ধারণ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ না হলেও বর্তমান জ্বালানি-সংকট অবশ্যম্ভাবীই ছিল। এটাকে খোলা চোখে অর্থনৈতিক সংকট মনে করা হলেও আদতে এর শিকড় অনেক গভীরে।

এ অবস্থায় আইএমএফ প্রদত্ত ঋণ ‘ফুটো কলসি সিনড্রোম’ বা ছিদ্রযুক্ত কলসিতে পানি ঢালার মতোই হতে পারে। অর্থাৎ, ফুটো কলসিতে পানি যতই ঢালা হোক, তাতে যেমন কলসি ভরবে না, তেমনি রাজনৈতিক তথা গণতন্ত্রের ঘাটতি পূরণ, অর্থাৎ জনগণের ভোটাধিকার ফেরত প্রদান এবং দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টানা সম্ভব না হলে অর্থনৈতিক সংকট থেকেই যাবে।

কেননা, দীর্ঘদিন ধরে চলমান স্বজনতোষণ, দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার ইত্যাদির কারণে কলসিতে ফুটো সৃষ্টি হয়েছে। কলসির ওই সব ফুটো বন্ধ না করে, অর্থাৎ অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও শাসনপ্রক্রিয়ার সংস্কারের পথে না হেঁটে ধার করে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা উলুবনে মুক্তা ছড়ানোরই নামান্তর।

কেননা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট সমাধান পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি সম্ভব নয়। তাই দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে কিছু কার্যকর রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রথম ও আবশ্যকীয় পদক্ষেপ হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। এর জন্য আবার প্রয়োজন নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার থেকে শুরু করে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ওই সরকারের অধীনে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান ও বিজয়ী দলের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। তবে শুধু নির্বাচিত সরকারই গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। কার্যকর

গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না করা, ব্যক্তিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্র পরিহার করা। পরিচ্ছন্ন ও জনমুখী শাসনকাঠামো গড়ে তোলা। বাক্স্বাধীনতাসহ নাগরিকদের সব অধিকার সমুন্নত রাখা।

পাশাপাশি সব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছ-জবাবদিহি প্রদর্শনের চর্চা করা, যথাযথ আইনি কাঠামো প্রণয়ন ও তা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সব কাজে সবার অন্তর্ভুক্তিকরণ, সমতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।

একটি কার্যকর ও টেকসই রাজনৈতিক সংস্কার উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আর এ প্রচেষ্টার ভিত্তি হতে পারে সুদূরপ্রসারী কিছু সংস্কার বা আরেকটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। স্মরণ করা যেতে পারে যে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে, যার সুফল আমরা পেয়েছিলাম ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮-এর সুষ্ঠু নির্বাচনের কারণে।

দুর্ভাগ্যবশত বন্দোবস্তটি ভেঙে দেওয়া হয় সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক উপায়ে এবং উচ্চ আদালতের রায়ের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে একতরফাভাবে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত না হলে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, ফুটো কলসি সিনড্রোমের কারণে যা দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আমাদের আশঙ্কা।

. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো  |  ২১ মার্চ, ২০২৩