রাষ্ট্রপতি সোমবার থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছেন। সংলাপ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে সমাধান হওয়াও জরুরি। কিন্তু এবারের সংলাপে সমাধানের আশা দুরাশা। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীও সবে শেষ হলো। বাংলাদেশের ৫০ বছরে আমাদের অর্জন নিয়ে বর্তমানে আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে- এ সময়ের মধ্যে মানুষ তাদের অধিকার কতটা পেয়েছে? বিশেষ করে মানুষের খাবারের জোগান নিশ্চিত হলেও ভোটের অধিকার নিয়ে অনেকের মধ্যে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কথা স্মরণ করতে পারি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণায় জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভোটের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, নাগরিকের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ বস্তুত সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ জন্যই লাখ লাখ বাঙালি রক্ত দিয়েছেন এবং এত ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে আমরা স্বপ্নের স্বাধীনতা পেয়েছি। সেই স্বাধীনতার দাবিই হচ্ছে ভোটাধিকার। যে নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পারবে, যার মাধ্যমে মানুষের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে মানুষের সেই আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। দুঃখজনকভাবে গত দুটি নির্বাচনে আমাদের সেটিই হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের অধিকার যেমন প্রতিষ্ঠা হয়নি, তেমনি গণতন্ত্র এবং সুশাসনও অধরাই রয়ে গেছে।

সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের আশা কেন দুরাশা, সেটি গত দুটি নির্বাচনের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। এর মধ্যে প্রথমটি হয়েছে একতরফা, মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়াই। দ্বিতীয়টি হয়েছে ‘মধ্যরাতের নির্বাচন’। রাষ্ট্রপতি এভাবে সংলাপের মাধ্যমে গত দুটি নির্বাচন কমিশনকে নিয়োগ দিয়েছেন- রকিবউদ্দীন কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশন। উভয় কমিশনই মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে। দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থাও তাদের সময়ই ভেঙে পড়েছে। ২০১২ ও ২০১৭ সালেও রাষ্ট্রপতি এ ধরনের সংলাপ করেছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলের কোনো মতামতের প্রতিফলন এতে ঘটেনি। আগের কমিশনগুলো যেমন জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে, ভবিষ্যতেও আরেকটি অনুগত কমিশনের মাধ্যমে তারই পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির এই সংলাপে হয়তো রাজনৈতিক দলগুলোর ফটোসেশন এবং চা চক্রে অংশগ্রহণের সুযোগ হবে কিংবা তাদের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রচার হবে। কিন্তু দেশের রাজনীতির পর্বতসম সমস্যার কোনো সমাধান আসবে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রপতির সংলাপ যদি শুধু নির্বাচন কমিশন নিয়োগের জন্য হয়, তবে তা আসলে অর্থহীন সংলাপ হবে। এ সংলাপ শুধু আনুষ্ঠানিকতা হবে। এ থেকে ফলপ্রসূ কিছু বেরিয়ে আসবে না। কারণ, সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে- ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’ অর্থাৎ রাষ্ট্রপতিকে সংবিধান অনুযায়ী নতুন ইসি গঠনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হবে। তাই এবারও প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী কমিশন গঠন হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী যা বলবেন, তাই রাষ্ট্রপতিকে শুনতে হবে।

তবে হ্যাঁ, সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে সংলাপের মাধ্যমে দেশের চলমান সংকটের একটা রাজনৈতিক সমঝোতা হওয়া দরকার। ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করাসহ দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। সেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে সংলাপ ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
আমরা একটি যোগ্য, দক্ষ, সৎ ও সাহসী কমিশন চাই; যাদের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে নির্বাচন কমিশন কারও পক্ষে কাজ না করে জনগণের প্রত্যাশিত প্রতিনিধিদের নির্বাচনের পথ সুগম করবে। প্রশ্ন হলো, সেই কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন কমিশন গঠনের পদ্ধতি কী? বলা বাহুল্য, সেটা সংবিধানেই রয়েছে। আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে। কিন্তু ৫০ বছরেও আইনটি হয়নি। নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের খসড়া করে আমরা সুজনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে দিয়েছি। তিনি যদিও বলছেন, স্বল্প সময়ে এত গুরুত্বপূর্ণ আইন করা সম্ভব নয়। আমরা মনে করি, এটি একটি খোঁড়া যুক্তি। সরকারের আরেকজন মন্ত্রী মঙ্গলবার বলেছেন, আগামী বছরের মধ্যে তারা আইন করবেন। কিন্তু আইনটা তো এখন জরুরি। আগামী বছর করলে তাহলে এবারের নতুন নির্বাচন কমিশন আগের নিয়মেই প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী গঠিত হবে। ফলে আবারও আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন নিয়োগের প্রত্যাশা করতে পারছি না। ফলে আমাদের ভাতের অধিকার অনেকটা নিশ্চিত হলেও ভোটের অধিকার অধরাই থেকে যাবে।

অতীতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত দুই কমিশনের চরম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণে যেভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে, সরকার কি ওই দুই কমিশনের সব কাজের দায় এড়াতে পারবে? সরকারের সদিচ্ছা থাকলে আইন করে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে স্বাধীন অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে ইসি গঠনে যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আইন করতে সময়ক্ষেপণ করলে তত দিনে নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এতে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদলের পথ প্রশস্ত হবে।

আমরা আশা করেছিলাম, সরকার সংবিধানের নির্দেশনা মেনে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তারা ঝুঁকি নিতে চান না। পুরোনো পথেই তারা হাঁটছেন। আমরা যদি কলাগাছ রোপণ করে আম পাওয়ার প্রত্যাশা করি, সেটা যেমন দুরাশা হবে; তেমনি আগের মতো সংলাপের মাধ্যমে প্রত্যাশিত নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টি চিন্তা করাও বাতুলতা মাত্র। এখানে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। লোক দেখানো সংলাপের আয়োজন করে আদতে যদি কোনো কাজই না হয়, তবে এই চা চক্র আর ফটোসেশন করে কী লাভ।

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের পাশাপাশি বর্তমান নূরুল হুদা কমিশনকে আমাদের ভোটাধিকার হরণের জন্য দায়বদ্ধ করা দরকার। নূরুল হুদা কমিশনের চরম অসাধারণ ও অনিয়মের অভিযোগসংবলিত দুটি চিঠি আমরা রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছি। এগুলোর প্রাপ্তিস্বীকার পত্রও আমরা পাইনি।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের প্রথম দিন যোগ দিয়েছে জাতীয় পার্টি। তারাও রাষ্ট্রপতির কাছে আইন করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে। সরকার সময়-স্বল্পতার কারণে ইসি গঠনের আইন প্রণয়ন সম্ভব নয় বললেও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেছেন, সরকার চাইলে আইন করা সম্ভব এবং তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের প্রয়োজনীয়তা সবাই অনুভব করছে। বস্তুত সেটিই সমাধানের পথ এবং তা এখনই করা জরুরি।

ড. বদিউল আলম মজুমদার :সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

তথ্য সূত্র: সমকাল | ২২ ডিসেম্বর ২০২১